• বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১১:৪০
নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা

নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি মামলা অবশেষে সাড়ে তিন কোটি টাকায় নিষ্পত্তি করা হয়েছে। গত ৮ আগস্ট সিদ্ধান্ত মোতাবেক যৌন হয়রানির শিকার ও মামলার বাদী গেইল রামরুপকে ৩ লাখ ১৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্তে বাংলাদেশি ট্রাফিক পুলিশ সাইদ রহিম দুদু’র সাথে চুক্তি করা হয়। দুদু নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ট্রাফিক ইনফোর্সমেন্ট এজেন্ট পদে কর্মরত অবস্থায় গেইল রামরুপ তার দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হন। প্রায় ২৬০০ সদস্য বিশিষ্ট ইউনিয়ন সিডব্লিউএ লোকাল-১১৮২-র সভাপতি ছিলেন সাইদ রহিম দুদু।

যৌন হয়রানির অভিযোগে বরখাস্ত হয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক ট্রাফিক ইউনিয়নের সভাপতি সাঈদ রহিম দুদু। অফিসের মহিলা সেক্রেটারি ৬ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা করেন তার বিরুদ্ধে। যৌন নিপীড়নের অভিযোগে নিউ ইয়র্ক পুলিশের ট্রাফিক এজেন্ট ইউনিয়নের সভাপতি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সভাপতি সাঈদ রহিমকে তার দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করে ইউনিয়নের দায়িত্বগ্রহণ করেন ওয়াশিংটনের সংগঠনের জাতীয় কমিটি। কমিউনিকেশন ওয়াকারকার্স অব আমেরিকা লোকাল ১১৮২-র শীর্ষ পদ হারানোর সাঈদ রহিম সাধারণ ট্রাফিক এজেন্টের মতো সার্বক্ষণিক ঘুরে ঘুরে টিকিট দেয়ার দায়িত্বপালন করেন। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর সাঈদ রহিমের বিরুদ্ধে উক্ত চাঞ্চল্যকর সংবাদটি প্রকাশ করেন নিউ ইয়র্কের দৈনিক ডেইলি নিউজ।

ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট সাঈদ রহিম দুদু (৬৭)-র বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে ৬ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে ম্যানহাটন সুপ্রিম কোর্টে ২০১৯ সালের ১৫ মে মামলা করেছিলেন অফিস সেক্রেটারি গেইল রামরুপ। মামলার নং- ১৬৭০৪৭/২০১৯. (The Sexual Harassment case at NYS Supreme Court of Manhattan. NSCEF Index # 157047/2019. Filed on 5/15/2019), যেহেতু সকল অপরাধ ইউনিয়নে কর্মরত সময়ের মধ্যে হয়েছে তাই উক্ত মামলায় ইউনিয়নকে ৫ লাখ ডলার এবং রহিমকে ১ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা হয়। রামরুপের ফোনে যত প্রমাণাদি ছিল তিনি তা আদালতে জমা দেন। সেসব প্রমাণাদি দেখে আদালতের কাছে উক্ত মামলার গুরুত্ব ও সত্যতা প্রমাণিত হয়। তখন সবাই ধারনা করেছিলেন এ সকল প্রমাণাদির জন্য সাঈদ রহিম দুদুর জেল হতে পারে। একজন সিটি এমপ্লয়ী যদি আদালতে দোষী প্রমাণিত হন তাহলে তার জেল হবে, চাকুরী চলে যাবে, অবসর জীবনের ভাতাও পাবেন না, ডিপার্টমেন্টের সুনাম ক্ষুণ্ণ হবে, তার সংসার ও সামাজিক সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব মানবিক কারণে আদালতের বাইরে ক্ষতিপূরণ দিয়ে মামলাটি সেটেল্ড করতে আদালতের আদেশ পাওয়ার জন্য ২০১৯ সাল থেকে সাঈদ রহিমের উকিল বারবার আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের কাছে। দীর্ঘ ৩ বছর পর গত ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২২ বিচারক ডেভিড কোহেন এক আদেশে সেটেল্ড করার অনুমতি দেন। আদালতের আদেশ পেয়েই ১ মাস পর সুচতুর রহিম নিজের টাকা বাঁচানোর জন্য গত জানুয়ারি ১১, ২০২৩ ব্যাংক্রাপ্টসি করেন। এজন্য এই মামলার ক্ষতিপূরণ সহ অনেকগুলো ব্যক্তিগত লোণ এবং ক্রেডিট কার্ডের টাকা পরিশোধ না করার আইনগত সুযোগ পেয়ে যান তিনি। যেমন: ওয়েব ব্যাংকের পাওনা ৩১ হাজার ডলার, প্রসপার ফান্ডিংয়ের ৬ হাজার ডলার, মেহেলা ব্যাংকের ৭ হাজার ডলার, নিজের বাড়িওয়ালার ক্ষতিপূরণ ৪ হাজার ডলারসহ অনেক গুলো। এছাড়া তার বিরুদ্ধে চলমান মামলা ভেলোসিটি ইনভেস্টমেন্টের মামলা, গেইল রামরুপের মামলা, ক্যাভেলরি এসপিভি মামলা, জেপি মরগান মামলা, চেজ ব্যাংকের মামলা, স্ট্যান্ডার্ড কনজুমার ব্যাংকের মামলা, বিভিন্ন ক্রেডিট কার্ডের মামলা এবং লোনের অপরিশোধিত টাকা। যেগুলো তিনি আর পরিশোধ করবেন না।

২০১৯ সালে এ মামলাটি হবার পর সভাপতি রহিমকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুনদায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন স্টাফ রিপ্রেজেনটেটিভ রিকি মরিসন। এই ইউনিয়নে চলমান অর্থনৈতিক অনিয়ম বিষয়ে ফরেনসিক অডিট করান রিকি মরিসন। সেখানে তারা ৩৭টি অনিয়ম পায়। এরপর রহিম নিজেকে নির্দোষ দাবী করে ন্যাশনাল কমিটির কাছে বিচার দেয়।

সিডব্লিউ এ-র অডিট এবং তদন্তে রহিমের বিরুদ্ধে ৩৭টি সুনির্দিষ্ট অপরাধ পাওয়া যায়। এরপর গত ৬ মে, ২০২০ তারিখে সিডব্লিউএ-রপ্রেসিডেন্সিয়াল মিটিংয়ে এই অভিযোগ গুলো আলোচনা করে রহিমকে দোষী প্রমাণ করে। কিন্তু সাংগঠনিক নিয়মে ঐদিন থেকে ৬০ দিনের মধ্যে কেউ সময় মতো চার্জ এনে বিচার না চাওয়ায় গত বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার প্রার্থিতা অযোগ্য করা সম্ভব হয়নি।

সাঈদ রহিমের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে জানা গেছে, নির্বাচনী প্রচারণায় জয়ী হলে ইউনিয়ন থেকে গাড়ি না নেবার ওয়াদা করেও তা রক্ষা করেননি। উল্টো ২ লাখ ডলারের ল্যান্ড রোভার গাড়ী নিয়েছেন, কিন্তু ইউনিয়নের পয়সায় নেয়া গাড়িটি নিজের নামে না নিয়ে তার স্ত্রীর নামে নেন। অথচ তার স্ত্রী এই ইউনিয়নের সদস্য নন। গাড়ি ব্যবহারের জন্য ইউনিয়নের অর্থে পেট্রল কিনলেও নিয়মিত চলাচলের জন্য ইউনিয়নের অর্থেই সাবওয়ের মাসিক কার্ডও নিতেন তিনি। এছাড়া তদন্তে সবমিলিয়ে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের ৩৭টি অভিযোগ পেয়েছিলো সংগঠনের জাতীয় কমিটি। সেসবের জন্য তিনি বিশ্বস্ততা হারিয়েছেন সবার কাছ থেকে।

একথা সবাই জানেন যে, নির্বাচনে বিজয়ের পর শপথ নেবার আগে কোন কর্মকর্তা তার পদ পদবী ব্যবহার করে কোন রকম চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন না। করলে তা অবৈধ বা অকার্যকর বলে গণ্য হয়। লোকাল-১১৮২-র ইউনিয়ন লিডাররা এ বছর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে বিজয়ী হলেও তারা শপথ গ্রহণ করেন দুই মাস পর ১৩ এপ্রিল,২০২৩। শপথের আগে তাদের কোন বোর্ড মিটিং হবার আইনও নেই এবং তারা কোন মিটিং করেননি। অথচ অজানা উদ্দেশ্যে চলমান যৌন হয়রানির মামলার সকল দায়িত্ব রিকি মরিসনের উপর দিয়ে দেন রহিম। সেভাবে উকিল দিয়ে ড্রাফট (সেটেলমেন্ট এগ্রিমেন্ট এন্ড জেনারেল রিলিজ) করে এনে নব নির্বাচিত সবার স্বাক্ষরও নিয়ে নেয় ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩। সেই চুক্তি মোতাবেক রিকি মরিসন যখন যে খরচ চেয়েছেন আমাদের ইউনিয়ন তখনই সেই টাকা দিয়ে দিয়েছে। ক্ষুব্ধ হয়ে যে মেয়েটি রহিমের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন তিনি এবং তার উকিল সবমিলিয়ে পেলেন ৩ লাখ ১৫ হাজার ডলার। আর মামলাটি শুধু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শুনানি দেরী করানোর জন্য ইউনিয়নের উকিল নিয়ে গেলেন ৪ লাখ ১৯ হাজার ডলার। এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? এমনভাবে সদস্যদের অর্থ অপচয় করার উদ্দেশ্যে নবনির্বাচিত কর্মকর্তাদের শপথ গ্রহণের ২ মাস পূর্বে অগ্রিম একটা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে নেয়া হয় এবং পরবর্তী কোন মিটিংয়ে এমনকি সাধারণ সভাতেও তারা এই চুক্তিনামা অনুমোদন করেনি। এই চুক্তিনামা একদম অবৈধ। এভাবে সদস্যদের টাকা ধ্বংস করার জন্য রহিমের উপর সদস্যরা খেপে উঠেছেন বলে জানা গেছে।

এ অবস্থায় সদস্যদেরকে শায়েস্তা করতে বেতন বৃদ্ধি বিষয়ক আসন্ন কন্ট্রাক্ট পাশ করাতে গড়িমসি শুরু করেছেন সাঈদ রহিম। ট্রাফিক এজেন্ট লেবেল-৩ এবং লেবেল-৪ এর ইউনিয়ন লোকাল-৯৮৩ সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা কন্ট্রাক্ট সাইন করবে। সকল ইউনিয়নের মতো সিটি তাদেরকেও যা অফার করেছিলো সেগুলোর সাথে তারা কিছু বেশী সুবিধা দাবী করে, এবং সিটি সেটা মেনে নিয়েছে। এজন্য তারা কন্ট্রাক্ট সাইন করতে যাচ্ছে। কিন্তু অজানা কারণে এ বছরের জুন ও জুলাই মাসের দুটো মিটিংয়ে না যেয়ে কন্ট্রাক্ট সাইন পিছিয়ে দিয়েছেন রহিম। এছাড়া সদস্যদের পক্ষে সিটির কাছে রহিম যে আসলেই কি কিনেছেন তা সদস্যদের কাছে পুরোটাই গোপন রেখেছেন। এসব বিষয়ে সদস্যরা ভীষন ক্ষুব্ধ। তারা রহিমের অপসারণের দাবীতে অনাস্থা দাবী তোলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

১৯৮০ সালে বাংলাদেশ থেকে নিউ ইয়র্কে আসেন সাঈদ রহিম দুদু। দেশ থেকে কেমিস্ট্রি ও আইন শাস্ত্রে ডিগ্রী নিয়ে এখানে এসে ২০০৫ সালে নিউ ইয়র্ক ট্রাফিক বিভাগে চাকুরীতে যোগ দেন তিনি। দুইবার সুপারভাইজার পদে পদোন্নতির সুযোগ এলেও ইউনিয়নের অর্থচুরির মামলায় আটকে যান।

অভিযোগের বিরুদ্ধে সাঈদ রহিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সবকিছু আদালতে বিচারাধীন সুতরাং এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না।

প্রবাস জীবন, আকাঙ্খা, প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সমীকরণ সবই লিখুন দৈনিক অধিকারকে inbox.odhikar@gmail.com আপনার প্রবাস জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুভূতিও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: inbox.odhikar@gmail.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড