• রোববার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

রুম নং: B-9

বাংলা চ্যানেল সাঁতার- ২০২৩

  মাহমুদুল হাসান মাসুম

২০ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:৩৯
ছবিতে বা থেকে মো: জিহাদ হুসেন, হাসান ইমাম তরঙ্গ, সাইফুল ইসলাম রাসেল, মাহমুদুল হাসান মাসুম, মো: কামাল হোসেন
ছবিতে বা থেকে মো: জিহাদ হুসেন, হাসান ইমাম তরঙ্গ, সাইফুল ইসলাম রাসেল, মাহমুদুল হাসান মাসুম, মো: কামাল হোসেন

২৪ ডিসেম্বর ২০২৩। রাত ১০.৩০ এর হানিফ পরিবহনের বাসে করে কক্সবারের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম আমরা ২১ জন। মূল উদ্দেশ্য টেকনাফ, ২৮ তারিখের "বাংলা চ্যানেল সাঁতার- ২০২৩" এ অংশগ্রহণ করা। সকালে কক্সবাজার পৌঁছে শালিক রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সেরে সৈকত পরিবহন এর এসি গাড়ি রিজার্ভ নিয়ে আমরা চলে যাই টেকনাফ আমাদের বুকিং করে রাখা "সী কোরাল" হোটেলে। পুরো ট্রিপটা সুপারভাইজ করে আমাদের জিহাদ। যথারীতি রুমের ধারন ক্ষমতা অনুযায়ী রুম ডিস্ট্রিবিউট করে দেয়া হয়। আমাদের ভাগে পরে হলরুমখ্যাত B-9। চতুর্থ তলার ডানদিকের সর্বশেষ রুম এটি। ১ টি সিঙ্গেল, ১ টি ডাবল, ১ টি ট্রিপল সাইজের মোট ৩ টি বেড রুমে। জিহাদ, রাসেল, কামাল, তরঙ্গ ও আমি মোট ৫ জন উঠলাম B-9 এ। প্রাকটিস ও বিভিন্ন ইভেন্টের সুবাদে সবার সাথে সবার পরিচয় থাকলেও একসাথে কোথাও থাকার সুযোগ হয়নি। রাসেল ভাইকে সিঙ্গেল বেড দিয়ে বাকী ১ টা তে জিহাদ আর কামাল, অন্যটাতে আমি আর তরঙ্গ উঠলাম।

ফ্রেশ হয়ে, চেঞ্জ করে আমরা প্রাকটিস সেশনের জন্য সবাই রেডি হয়ে বের হলাম। রাসেল ভাইয়ের তত্বাবধানে আনন্দ উৎসাহ নিয়ে প্রথমদিনের ট্রেণিং সেশন শেষ করে রুমে এসে শাওয়ার নিয়ে চলে গেলাম লাঞ্চ করতে। টেকনাফের সোনারগাঁও খ্যাত কস্তুরি রেস্টুরেন্টে খেয়ে সবাই যারপরনাই হতাশ। রুমে এসে সবাই একটু রেস্ট করে নিলাম। রাতের খাবারের জন্য বের হয়ে খাওয়া দাওয়া শেষে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে রুমে ফিরে শুরু হয় গল্প আর আড্ডা। ধীরে ধীরে রুমের সবার সাথে সবাই ফ্রী হতে থাকে, আন্তরিকতা তৈরি হতে শুরু করে।

রাসেল ভাই এবার ৬ষ্ঠ বারের মতো বাংলা চ্যানেলে এসেছেন এবং একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে বাংলা চ্যানেল ক্রসিং এর রেকর্ডহোল্ডার। এর বাইরে সুইমিংয়ের প্রফেশনাল কোচ। জিহাদ এবার ৪র্থবারের মতো বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিবে। আর কামাল ৩য় বারের মতো। আমি আর তরঙ্গ সাতারেও একেবারে নতুন আর এবারই আমাদের ১ম এটেম্পট।

সুযোগ পেলেই ওদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনি, বিভিন্ন টিপস নেই, মনে আতঙ্ক আর সাহস দুটোরই সঞ্চার হচ্ছে। পরদিন ২য় দিনের ট্রেনিং সেশনে যাই টেকনাফ বীচে। এর মধ্যে আমাদের আরো কিছু লোকজন টেকনাফ এসে পৌঁছে। আমরা প্রায় ২৭ জন সাতারুর টিমে পরিনত হই। রাসেল ভাই স্ট্রেচিং এর সেশন শেষ করেন, তারপর আমরা দলবেঁধে সমূদ্রে নামি। প্রায় ১ ঘন্টার সেশন শেষ করে ওঠার পর আমি ডান শোল্ডারের নিচে একটা ব্যাথা অনুভব করি এবং রাসেল ভাইদের সাথে ব্যাপারটা শেয়ার করি। ঠিক হয়ে যাবে বলে সাহস দেয়। আমরা কিছুক্ষণ ভেজা শরীরে আড্ডা দিয়ে ছবি তুলে হোটেলে ফিরে আসি। শাওয়ার নিয়ে খাবারের নতুন দোকানের সন্ধানে বের হই। নতুন একটা সাধারণ হোটেলে ঢুকি এবং খাবার খেয়ে সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে। আমরা আড্ডা মারতে টেকনাফ বীচে যাই। "ক্যালসিয়াম" নামের একটা মজাদার খাবার ট্রাই করি সবাই মিলে, তারপর কিছুক্ষণ আড্ডা মেরে চা খেয়ে সবাই হোটেলে ফিরে আসি। খাবার খাওয়ার পর অনুভব করি আমার দুপুরের ব্যথাটা ঠিক হয়নি। রাসেল ভাইকে জানানোর পর ওনি প্রায় ২০/২৫ মিনিট নিজ হাতে আমাকে মাসাজ করে দেয়। বিষয়টা খুব সাধারণ মনে হলেও আমার মনে নাড়া দিয়ে যায়। কিছুটা আরাম অনুভব করি। জমে উঠে B-9 এর আড্ডা। রুমটা বড় হওয়ায় মোটামুটি সবাই আসা যাওয়া করতো, এতে আড্ডাটা আরো জমে উঠতো। পরদিন অর্থাৎ রেসের আগের দিন আমাদের তেমন সুইমিং শিডিউল ছিলোনা। কিন্তু রেগুলার স্ট্রেচিং আর রিল্যাক্স সুইমিং, ভেসে থাকার একটা সেশন করার প্ল্যান রেডি করে রাতে ঘুমিয়ে পরি। এই দুইদিনেই আমরা ৫ জন মানুষের ৫ জনমের আপন মানুষে পরিণত হই। সবার প্রতি সবার দায়িত্ববোধ ,অধিকার জন্ম নেয়া শুরু করে।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে লাস্ট ডে ট্রেণিংয়ের জন্য সবাই বেরিয়ে পরি। যথারীতি স্ট্রেচিং শেষ করে রিল্যাক্স সুইমিংয়ের প্ল্যান থাকলেও আমরা ১ ঘন্টার সুইমিং সেশন শেষ করি। চূড়ান্ত দিনের প্রস্তুতি শেষ করার পর সবার মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা, একটা থমথমে অবস্থা কাজ করে। সবাই সবার মতো আনন্দ ফূর্তি করে হোটেলে ফিরে আসি। কারন আমরা কেউ জানিনা কালকে কার ভাগ্যে কি রয়েছে। কে ফিনিশারের হাসি হাসবে আর কে DNF হবে। কিন্তু ৩ দিনের সেশন শেষ করে সবার মনের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস কাজ করা শুরু করে। হোটেলে ফিরে এসে দেখি ছোটভাই সাগর আমাদেরকে অনুপ্রেরণা দিতে ঢাকা থেকে টেকনাফ এসে পৌঁছেছে। আমরা বের হই টেকনাফ উপজেলার মাননীয় UNO জনাব আদনান চৌধুরীর সাথে সাক্ষার করতে। উদ্দেশ্য, অফিশিয়াল দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। ওনাকে না পেয়ে আমরা যাই শাহ পরীর দ্বীপ, আমাদের রেস স্টার্টিং পয়েন্টে। সেখানে কিছু অফিশিয়াল কাজ শেষে ফিরে আসি UNO অফিসে। এবার আদনান সাহেবকে পাওয়া গেলো। পরিচয়ের এক পর্যায়ে জানতে পারি ওনি আমার ব্যাচমেট। আনুষ্ঠানিকভাবে দাওয়াত পৌঁছে দিয়ে বের হয়ে লাঞ্চ সেরে আমরা হোটেলে ফিরে আসি।

দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে। আমরা ইভেন্ট ডের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে থাকি। রাতে আমাদের রুমে অফিশিয়াল মিটিং হবে। অফিশিয়াল ইন্সট্রাকশন দেয়া হবে রেস ডের জন্য। তাই আমরা একটু আর্লি ডিনার করে রুমে চলে আসি। সব রুমের সবাই B-9 এ উপস্থিত হয়। মিটিংয়ে নানা ধরনের পরামর্শ ও অফিশিয়াল ইন্সট্রাকশন দেয়া হয়। মিটিং পরিচালনা করেন, দ্যা সী হর্স খ্যাত সাইফুল ইসলাম রাসেল। মিটিং শেষ করে সবার জন্য সবাই শুভ কামনা জানিয়ে যে যার রুমে ফিরে যায়।

মিটিংয়ের পর থেকেই বুকটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করে। সত্যিকারে অনুভব করতে শুরু করি, আমরা আসলে কেন এসেছি এখানে, কি অজেয়কে জয় করতে এই এডভেঞ্চারকে ধারণ করতে এসেছি। বিকেল থেকেই খেয়াল করছিলাম তরঙ্গ স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেনা। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকছে। রাতে সবাই রুম থেকে যাওয়ার পর আমরা সবাই সবার ব্যাগ ফাইনালি রেডি করে ফেলি। রাসেল, জিহাদ, কামালের পরামর্শ নিয়ে কোথায় কিভাবে কি করা লাগবে সেভাবে নিজেদের সব গুছিয়ে নেই। পরদিন সকালের নাস্তার জন্য ব্রেড, নসিলা, কলা, দই আর পর্যাপ্ত পানি এনে রাখা হয়। আমার পিঠের ব্যাথার অবস্থাটা শেয়ার করার পর রাসেল ভাই আবারো আমাকে দীর্ঘসময় খুব আন্তরিকতার সাথে মাসাজ করে দেয়। আমার দেখাদেখি কামাল, জিহাদ, তরঙ্গও বায়না ধরে ওদেরকেও মাসাজ করে দেয়া লাগবে। রাসেল ভাই মোটেও বিরক্ত না হয়ে সবাইকে মাসাজ করে দিতে থাকে।

মাহমুদুল হাসান মাসুম

যেই লোকটা নিজে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য সমূদ্রে নামে, রুটিন লাইফ লিড করে সেই মানুষটা রেস ডে র আগের রাতে ৪ জনকে প্রায় ১ ঘন্টা নিজ হাতে মাসাজ করে দিলো। বিষয়টা চিন্তা করতেই ওনার প্রতি শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে গেলো। তারপর রেস ডে নিয়ে রাসেল ভাই, জিহাদ, কামাল কিছু অভিজ্ঞতা ব্রীফ করে, সাহস দেয়। আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য কিছুক্ষণ দুষ্টামি করি, ফানি ভিডিও মেইক করি। রাতে শাওয়ার নেই, নামাজ পড়ে আল্লাহর নামে ঘুমাতে যাই।

সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে নামাাজ আদায় করি। রাতেই সব রেডি করে রাখা ছিলো, তাই ঝটপট নাস্তা খেয়ে টিম B-9 সবার শুভেচ্ছা স্বাক্ষর রেখে রুম ত্যাগ করি। প্ল্যান অনুযায়ী শাহ পরীর দ্বীপের পশ্চিম বীচে পোঁছাই। সকল ফরমালিটিস শেষ করে বুকে অসীম সাহস সঞ্চার করে অথৈ দরিয়ায় নিজেকে সপে দেই ৯.৩০ মিনিটে। আমৃত্যু মনে রাখার মতো ৪.৩৮ মিনিটের একটা জার্ণি শেষে পায়ের তলায় সেন্টমার্টিন এর মাটি খুঁজে পাই। সে এক অন্যরকম অনুভূতি। তীরে পৌঁছে সর্বপ্রথম মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে শুকরিয়া জানাই। রাসেল ভাই ৩.৩৫ মিনিট সময় নিয়ে সবার প্রথম ফিনিশ করে। কামাল ৪.২৭ মিনিট সময় নিয়ে ফিনিশ করে। জিহাদ ও তরঙ্গ যথাক্রমে ৫.১৫ ও ৫.২৪ ঘন্টা সময় নিয়ে সুস্থভাবে বাংলা চ্যানেল সাঁতার- ২০২৩ ফিনিশ করে আলহামদুলিল্লাহ। রুম নং- B9 ১০০% সফলতার মাধ্যমে বাংলা চ্যানেল সাঁতার- ২০২৩ শেষ। সেন্টমার্টিনে থাকা বাকী দিনগুলোও আমরা সেইম রুমেই থেকেই আমাদের জার্ণিটা শেষ হয়। জার্ণি শেষ হয়, কিন্তু শুরু হয় ৫ জন তথা ৪২ জনের একটা পরিবারের আত্মিক বন্ধন। যে বন্ধনটা চাওয়া পাওয়া, ব্যক্তি স্বার্থের অনেক উর্ধ্বে।

এই জার্ণিটা রাসেল দ্যা সী হর্স কে একজন প্রাইভেট কোচ থেকে একজন সর্বজনীন কোচ এ রুপান্তরিত করে। নিজের কোচিং দক্ষতা আর ভালবাসা দিয়ে সবার ভালবাসার মনিকোঠায় স্থান করে নেয় বাংলাদেশের গর্ব, বাংলা চ্যানেল সাঁতারের গর্ব সাইফুল ইসলাম রাসেল।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: inbox.odhikar@gmail.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড